ক্রিকেট: ৪২ বছরে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বে ছিলেন যারা

ক্রিকেট: ৪২ বছরে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বে ছিলেন যারা

হাটি হাটি পা পা করে বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গণে বাংলাদেশ আজ এক উজ্জ্বল নাম। ১৯৭৭ সালে আইসিসির সহযোগী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। এরপর নানা সময়ে নানা ক্রিকেটারের হাত ধরে উঠে এসেছে আজকের টিম বাংলাদেশ। সাদাকালো শুরুর গল্পে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জনটাও ছিলো রঙহীন। কিন্তু বিশ্বদরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে প্রথম স্কেচ তারাই করেছিলেন। যেখান থেকে রঙীন হয়েছে লাল-সবুজের দল।

এই লাল-সবুজের দলকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের ক’জনকেই বা মনে রাখি আমরা। কেবল দৃশ্যমান অর্জনে যারা সামনে থাকে, শুধু তাদের কথাই স্মরণ করি। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বে আজকের বাংলাদেশ গড়ার কারিগর কি কেবল তারাই? উত্তর হবে না।

শামীম কবির: আইসিসি’র সহযোগী সদস্য হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন শামীম কবির। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে সফরকারী এমসিসি দলের বিপক্ষে বিসিসিবি একাদশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সেটিই ছিলো বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম ম্যাচ।

চোখে পড়ার মতো কোন অর্জন নেই সেই বাংলাদেশ দলের। কিন্তু তার হাত ধরেই যাত্রা শুরু। যা আজকের টিম বাংলাদেশ। 


রকিবুল হাসান: ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমের পরে শামীম কবির অবসর গ্রহণ করলে তার উত্তরসূরী হন রকিবুল হাসান। তার হাত ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে অংশগ্রহণ করে রকিবুল বাহিনী। ওই টুর্নামেন্টে চার ম্যাচ থেকে দু’টি করে জয়-পরাজয়ের মুখ দেখে বাংলাদেশ।

শফিকুল হক হীরা: রকিবুল হাসানের হাত থেকে নেতৃত্বের ঝান্ডা তুলে নেন শফিকুল হক হীরা। তার নেতৃত্বে ১৯৮২ সালে আইসিসি ট্রফিতে সাতটি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। যার মধ্যে ৩টিতে পরাজিত হলেও চারটিতে জয় পায় শফিকুল হক হীরার দল। আসর শেষ করে চার নম্বরে থেকে।



গাজী আশরাফ: ১৯৭৭ সালে আইসিসির সহযোগী সদস্য হলেও বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচ খেলে ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ। এশিয়া কাপ ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই ম্যাচের নেতৃত্বে ছিলেন গাজী আশরাফ। 

১৯৮৫ সালে অধিনায়কত্ব পাওয়া গাজী আশরাফের অধীনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক একদিনের মোট ৭টি ম্যাচ খেলে। পরাজিত হয় ৭টিতেই। 


মিনহাজুল আবেদীন নান্নু: গাজী আশরাফের পর অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। মাত্র দু’টি ম্যাচ হয় তার নেতৃত্বে, যার দু’টিতেই পরাজিত বাংলাদেশ।



আকরাম খান: বাংলাদেশের রঙীন অধ্যায়ের শুরু যার হাত ধরে, তিনি আকরাম খান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের দেখা পায় তার অধীনেই। তার সময়েই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। বিশ্বদরবারে নতুন নামের আবির্ভাব হয়। 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পর বাংলাদেশ একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম জয়ের দেখা পায় ১৯৯৮ সালে। ২২টি খেলায় হারের পর ভারতের মাটিতে কেনিয়ার বিপক্ষে প্রথম জয় পায় বেঙ্গল টাইগার। শুরু হয় বাংলাদেশের জয়যাত্রা। 

আকরাম খানের অধীনে ১৫টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ, যার মধ্যে ওই একটিতেই জয়ী। 

আমিনুল ইসলাম বুলবুল: আকরাম খানের অধিনায়কত্ব শেষ হলে দায়িত্ব পান তারই সতীর্থ আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ ৯৯’-এ অংশ নেয় বাংলাদেশ। নিজেদের অভিষেক আসরেই বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ। দলের অসাধারণ ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিংয়ে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান এবং স্কটল্যান্ডকে হারায় টাইগাররা। এই জয়ই পরবর্তীতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক টেস্ট দলের সদস্য হতে সহায়তা করে।

বিশ্বকাপের ওই দু’টি ম্যাচ ছাড়াও আরো ১৪টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। কিন্তু জয় বিশ্বকাপের ওই দুই ম্যাচেই।

নাইমুর রহমান দুর্জয়: ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। সে বছরের নভেম্বরে প্রথম টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে হারলেও আলো ছড়ায় টাইগাররা।

নাইমুর রহমানের অধীনেই আরো ৬টি টেস্টে মাঠে নামে বাংলাদেশ। কোন জয় না থাকলেও, প্রথম ড্রয়ের স্বাদ নেয় নাইমুর রহমানের নেতৃত্বেই। অভিষেকের পরের বছরেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে টেস্ট ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে মাত্র ৬টি ম্যাচ।

৪টি ওয়ানডেতেও অধিনায়কত্ব করেন নাইমুর রহমান। যদিও একটিতেও সাফল্য ধরা দেয়নি।

খালেদ মাসুদ পাইলট: আইসিসি ট্রফির ফাইনালে খালেদ মাসুদের ব্যাটিং নিশ্চই আজও সবার স্মৃতিতে স্পষ্ট। নাইমুর রহমানের পর দলের নেতৃত্ব দেন সেই উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান। ২০০১ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের জুন পর্যন্ত অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে ৩০ ওয়ানডে ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ। যার মধ্যে জয় আসে ৪টিতে।

অন্যদিকে ১২টি টেস্ট খেলে পাইলট বাহিনী। তাতে জয় ধরা দেয়নি একটিতেও।

খালেদ মাহমুদ সুজন: খালেদ মাসুদের অধিনায়ক অধ্যায় শেষ হলে দায়িত্ব পান খালেদ মাহমুদ সুজন। ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ওয়ানডে ও টেস্টে দুই বছর অধিনায়কত্ব করলেও জয়ের দেখা পায়নি একটিতেও। তার অধীনে ৯টি টেস্ট ও ১৫টি ওয়ানডে খেলে টিম বাংলাদেশ।


হাবিবুল বাশার সুমন: বাংলাদেশের অধিনায়কের অধ্যায়ে সফলতার মুখ দেখান যিনি, তিনি হাবিবুল বাশার সুমন। টানা ২১ টেস্ট হারার পর হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বেই ২০০৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ড্র করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। যদিও খারাপ আবহাওয়ার কারণে ৩ দিন খেলা বন্ধ থাকে। ২০০৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয়বার ড্র করে টাইগাররা। তার অধীনেই আসে ঐতিহাসিক প্রথম জয়। ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের মাটিতে জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে প্রথম জয় পায় বাংলাদেশ। হাবিবুল বাশারের অধীনে মোট টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় ১৮টি। যার মধ্যে আছে ১টি জয় ও ৪টি ড্র। 

ওয়ানডেতেও তার নেতৃত্ব ছিলো সফল। তার অধীনেই ৬৯ ওডিআই খেলে বাংলাদেশ। যার মধ্যে জয় পেয়েছে ২৯টি ম্যাচে।

মোহাম্মদ আশরাফুল: বাংলাদেশ যখন যেকোন দল হারানোর সামর্থ্য যোগাচ্ছে, সেই সময় তারকা খ্যাতি পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি মোহাম্মদ আশরাফুল। যদিও তার নেতৃত্বে দল খুব বেশি আলো ছড়াতে পারেনি। তার অধীনে ৩৮টি ওয়ানডে থেকে টাইগাররা জিতেছে মাত্র আটটিতে। আর ১৩ টেস্টে জয়শূন্য ছিলো বাংলাদেশ। সফলতা বলতে কেবল একটিতে ড্র।


সাকিব আল হাসান: বর্তমানে টেস্টের নিয়মিত অধিনায়ক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ব্যক্তিগত অর্জনে তারকাদের তারকা তিনি। সাকিব ২০০৯ সালে প্রথম অধিনায়কত্বের সুযোগ পেলেও, মাঝে তা আবার হারান। তার অধীনে ৩টি টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। তার জন্য খেলতে হয়েছে ১৩টি টেস্ট। ওয়ানডেতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। ৫০টি ওডিআই থেকে ২৩টিতে জয় পেয়েছে তার দল।


মুশফিকুর রহিম: মুশফিকের হাত ধরে ক্রিকেটে অভিজাত সংস্করণ টেস্টে সবচেয়ে বেশি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ৩৪টি টেস্ট থেকে ৭টি ম্যাচে জয় পায় বাংলাদেশ। তার সময়কালেই অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিকেও পরাজিত করেছে টাইগাররা। তিনি মোট ৩৪টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩৭ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করে জয় তুলে নিয়েছে ১১টি ম্যাচে।


মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা: বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা অধিনায়ক কে? এই প্রশ্নে এক কথায় যার নাম উঠবে, তিনি মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। তার নেতৃত্বগুণ বিশ্ব মহলেও প্রশংসিত। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি।

ক্যাপ্টেন ম্যাশের অধীনে ৮৫ ওয়ানডে থেকে ৪৭টি জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টেও করেছেন অধিনায়কত্ব। তবে মাত্র একটিতে। তাতে জয় শতভাগ।


এছাড়াও অনিয়মিতভাবে রাজিন সালেহ ২টি ম্যাচে ও তামিম ইকবাল ৩টি ওয়ানডেতে দায়িত্ব পালন করেছেন। দু’জনেই জয়শূন্য।

টেস্টে অনিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তার অধীনে ৬ ম্যাচ থেকে ১টি জয় ও ১টি ড্র করে বাংলাদেশ।  

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিয়েছেন ৬জন। শাহরিয়ার নাফিজ ১ ম্যাচ থেকে ১টি জয়, মোহাম্মদ আশরাফুল ১১টি ম্যাচ থেকে ২টি জয়, সাকিব আল হাসান ১৪টি ম্যাচ থেকে ৩টি জয়, মুশফিক ২৩টি ম্যাচ থেকে ৮টি জয়, মাশরাফী ২৮টি ম্যাচ থেকে ১০টি জয় এবং মাহমুদুল্লাহ ৫টি ম্যাচ থেকে পেয়েছেন একটি জয়।


নাবা/ডেস্ক/তারেক


এখানে বিজ্ঞাপন দিন

রিলেটেড নিউজঃ

0 মন্তব্য

মতামত দিন