এখানে সবাই তুই তুই

  • প্রকাশিতঃ 2019-08-01 11:40:15
এখানে সবাই তুই তুই

ওরা সবাই বন্ধু। পড়তো সিলেটের এম সি কলেজে। পড়ালেখার পাশাপাশি কলেজের ক্লাস ফাকি দেওয়া, স্যারের বাসায় টিউশন পড়তে গিয়ে খুনসুটি, আর ক্লাসের মায়াবতী রিমিকে চিঠি লেখা-সব কিছুই করেছে একসাথে। যাকে বলে পার্টনার-ইন-ক্রাইম!

১৯৯৭ এর সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে যেদিন এইচএসসি’র রেজাল্ট প্রকাশ হলো, অন্য সব সহপাঠীদের সাথে তারাও গিয়েছিল রেজাল্ট আনতে। রেজাল্ট ভালোই হয়েছিল সবার। এরপর কেটে গেছে বেশ ক’টি বছর।

জীবনের তাগিদে লিমন পাড়ি জমালো লন্ডনে; পড়াশোনা শেষ করে সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত জীবন। এইদিকে হাসান দেশেই প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী। মাঝের এতো বছর আর যোগাযোগ হয়নি। প্রথম দিকে বেশ কয়বার ই-মেইলে যোগাযোগ হলেও পরে আর সম্ভব হয়নি।

প্রায় ২০ বছর পর তথ্যপ্রযুক্তির এই উন্নয়নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের এক কমন গ্রুপের মাধ্যমে দুই বন্ধু আবার নিজেদের খুঁজে পেলো!

গ্রুপটির নাম এসএসসি ৯৫-এইচএসসি-৯৭ (৯৫৯৭ নামেও পরিচিত)। বন্ধত্বের ভুবনে সবাইকেই স্বাগতম জানিয়ে ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৭ সালের এইচএসসিতে অংশগ্রহণকারী সহপাঠী ও ব্যাচমেট বন্ধুদের একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে বন্ধুদের সবাইকে।

দেশে এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যেই এই ভার্চ্যুয়াল গ্রুপের জন্ম হয় ২০১৬ সালে। সবার মাঝে সৌহার্দ্য আর সহযোগিতার বন্ধন তৈরি করে বন্ধুদের নিয়ে মাঝে মাঝে হাসি আর আনন্দে মেতে উঠার একটা ব্রিদিং স্পেস এটি।

ভার্চুয়াল এই গ্রুপটিতে প্রায় ১৩ হাজার মেম্বার রয়েছে। যারা সবাই সবার কাছের বন্ধু। এরা সবাই একে অপরকে তুই বলে সংবোধন করেই যেনো তৃপ্তি পায়। তাই এখানে আপনি, তুমি অনুপস্থিত।

নিজেদের লেখা গল্প, কবিতা, কিংবা তোলা ছবি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে গ্রুপটি হয়ে উঠে কারো অসুস্থতা, রক্তের কিংবা কোনো তথ্যের প্রয়োজনে একে অন্যের জন্য এগিয়ে আসার একটি মাধ্যম।

সবার মুল উপস্থিতি ভার্চুয়াল হলেও স্বল্প পরিসরে কিছু সামাজিক আয়োজনও করে থাকে গ্রুপের মেম্বাররা। বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করে বন্ধুদের মিলন মেলা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জুলাই ২০১৯ অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ৯৫৯৭ গ্রুপের বন্ধুদের দিনব্যাপী মিলন মেলা। এইবারের আয়োজন সিলেটের এক্সসেলসিউর রিসোর্টে। আর আয়োজক ৯৫৯৭-এর সিলেটের বন্ধুরা।

এর সূত্র ধরেই প্রায়-হারিয়ে যাওয়া প্রানের বন্ধু লিমন আর হাসানের আবার দেখা-২০ বছর পর!

গ্রীষ্মের ছুটিতে পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে লিমনের মতো আরো অনেক প্রবাসী বন্ধুরা এসেছে দেশে। একই সময়ে সিলেটেই এই আয়োজন যেন ‘চেরী অন দা টপ’!

লিমন আর হাসানের মতো আরো অনেক সহপাঠী বন্ধুকে প্রাত্যহিক জীবনের ব্যাস্ততায় বাস্তবে একে অন্যের থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছে।

ভার্চ্যুয়াল এই প্ল্যাটফর্ম তাদের আবার একত্রিত করার সাথে সাথে নতুন বন্ধুদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আর দেশে এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের সাথে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ থাকলেও রিইউনিয়ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সামনা-সামনি দেখা এবং পরিচয় হওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায়নি। ফলে ২৬ শে জুলাইয়ের এই রিইউনিয়ন পরিনত হলো সূদুর ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাংগামাটি, রাজশাহী, যশোরসহ দেশে ও বিদেশ বসবাসকারী প্রায় ২০০ বন্ধুর এক মিলনমেলায়!

সারাদিন কেটেছে রিসোর্টের মনোরম পরিবেশে হাসি-আনন্দ আর আড্ডায়। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ এসেছে সারারাত ট্রেনে, কেউ সড়কপথে। কিন্তু এতদিন যাদের সাথে ভার্চ্যুয়াল সখ্যতা, তাদের সামনাসামনি দেখে রাত-জাগার ক্লান্তি যেন মূহুর্তেই শেষ।

সকালের নাস্তা শেষে সুইমিং পুলে ‘পুল-ভলি’ খেলা আর ক্রিকেট ম্যাচ তো ছিলই, সাথে ছিল বন্ধুদের আড্ডা আর খুনসুটি! দুপুরে জম্পেশ লাঞ্চের পর আনন্দঘন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আর সাথে ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী নাচ।

বাইরে হাল্কা বৃষ্টি আর অডিটোরিয়ামের ভিতর গানের তালে আর ড্রামের বিটে বন্ধুদের কেটে গেলো পুরো সন্ধ্যা! কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে এক চিলতে দখিন হাওয়ার মতো কেটে গেলো মনে রাখার মতো একটি দিন!

সিলেটের আয়োজক বন্ধুদের আন্তরিকতা আর আতিথেয়তায় দেশের ও বিদেশের বন্ধুরা মুগ্ধ! সুন্দর আয়োজন আর হাসিমুখে সবার সব রকম প্রয়োজনের খেয়াল রাখার মাধ্যমে তারা জায়গা করে নিলো সবার হৃদয়ের মনিকোঠায়।

 

একটি ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্ম যে মানুষে-মানুষে এমন মেলবন্ধন তৈরি করতে পারে, তা হয়তো অংশগ্রহণকারীরাও আগে অনুধাবন করতে পারেনি।

 

এখনো ৯৫৯৭ ব্যাচের অনেক বন্ধু রয়ে গেছে এই প্ল্যাটফর্মের বাইরে। তবে এই ধরনের মিলনমেলা তাদের আবার নিয়ে আসতে পারে বন্ধুত্বের একই ছায়াতলে। এই রিইউনিয়ন সিলেটের অনেক পুরনো বন্ধুকেও একে অন্যের কাছে নিয়ে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহু নেগেটিভ দিক থাকলেও এর পজিটিভ দিক অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম না থাকলে পুরনো বন্ধুদের কি আর খুজে পাওয়া যেতো? ৪০এর কোঠায় পা দেওয়া কর্মব্যস্ত এক দল বন্ধুর এমন একটা ব্রিদিং স্পেস খুব দরকার!

বন্ধুত্বে কোনো সংঙ্গা নেই। নেই কোনো জাতী, ধর্ম, বর্ণ, বা অবস্থানগত বিভেদ। এমন একটি বন্ধুত্বের বন্ধন সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে যেতে পারে অনেকদূর। করতে পারে অনেক কিছু জয়।নাবা/ডেস্ক/কেএইচ/

এখানে বিজ্ঞাপন দিন

4 মন্তব্য

  • আব্দুল ফাত্তাহ

    2019-08-01 14:32:52

    অসংখ্য ধন্যবাদ। লেখাটি তৈরিতে আমাদের বন্ধু সুমির পরিশ্রম স্বার্থক।

  • Md Rokon Uddin Akbar

    2019-08-01 14:46:58

    আমি নিজেই এই প্লাটফর্মের একজন গবর্িত সদস্য। এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আমি পেয়েছি হাজারো নিবেদিত প্রান বন্ধু।

  • Md Rokon Uddin Akbar

    2019-08-01 14:48:38

    আমি নিজেই এই প্লাটফর্মের একজন গবর্িত সদস্য। এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আমি পেয়েছি হাজারো নিবেদিত প্রান বন্ধু।

  • মোহাম্মদ শাহ্ নেওয়াজ

    2019-08-01 15:25:03

    অসম্ভব গুছানো পরিবেশনা, আশাকরি ৯৫/৯৭ এভাবেই গোছানো থাকবে বাকি সময় গুলোতেও।

মতামত দিন